
বাইবেল অনুযায়ী স্বপ্নের ব্যাখ্যা: বাইবেলে স্বপ্নের অর্থ কী?
স্বপ্নে সাপ দেখলে ঘুম ভেঙে মনে হতে পারে, এটি কি কোনো সতর্কবার্তা ছিল? প্রিয় কাউকে হারানোর পর তাকে স্বপ্নে দেখলে সেই অনুভূতি সারাদিন মন থেকে না-ও যেতে পারে। গির্জার সূচনালগ্ন থেকেই খ্রিস্টানরা স্বপ্নের অর্থ নিয়ে ভাবছেন। এ বিষয়ে তাদের কাছে সমৃদ্ধ একটি উৎসও রয়েছে, কারণ বাইবেলে শতাধিকবার স্বপ্ন ও রাতের দর্শনের উল্লেখ আছে। এর কিছু স্বপ্নকে ঈশ্বরের বার্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, আবার অনেক স্বপ্নকে স্বাভাবিকভাবেই দেখা হয়েছে। এই নির্দেশিকায় বাইবেলের বিখ্যাত স্বপ্ন, বাইবেলে বর্ণিত বিভিন্ন ধরনের স্বপ্ন, আজকের খ্রিস্টানরা কীভাবে একটি স্বপ্ন যাচাই করেন এবং বাইবেলের আলোকে বহুল আলোচিত স্বপ্নের প্রতীকগুলোর অর্থ তুলে ধরা হয়েছে।
খ্রিস্টধর্মে স্বপ্নের কি কোনো অর্থ আছে?
বাইবেল পড়লে সহজেই বোঝা যায়, রাতের ঘটনাগুলোর গুরুত্ব কতটা। যাকোব আলোর সিঁড়িতে ঈশ্বরের সাক্ষাৎ পান। তরুণ যোসেফ নত হওয়া আঁটি ও নক্ষত্রের মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যৎ দেখেন। বহু শতাব্দী পরে আরেক যোসেফ ঘুমের মধ্যে নির্দেশ পান, মরিয়মকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে। দানিয়েল বিদেশি রাজদরবারে সেবা করেন, যেখানে রাজাদের ঘুমের মধ্যেই ঈশ্বর তাদের অস্থির করে তোলেন। ইয়োব গ্রন্থে বিষয়টি স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: 'কারণ ঈশ্বর কথা বলেন, কখনও একভাবে, কখনও অন্যভাবে, যদিও মানুষ তা বুঝতে পারে না। তিনি স্বপ্নে, রাত্রিকালীন দর্শনে, যখন গভীর নিদ্রা মানুষের ওপর নেমে আসে, তখন কথা বলেন' (ইয়োব ৩৩:১৪-১৫)।
তবে একই বাইবেল স্বপ্নকে ভবিষ্যদ্বাণীর নির্ভুল মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে বলে না। উপদেশক ৫:৭-এ বলা হয়েছে, 'অতিরিক্ত স্বপ্ন ও অনেক কথা অর্থহীন।' আবার যিরমিয় ঈশ্বরের নামে নিজেদের কল্পনাকে প্রকাশ করতেন এমন ভাববাদীদের কঠোরভাবে তিরস্কার করেছেন (যিরমিয় ২৩:২৫-৩২)। তাই খ্রিস্টানদের দৃষ্টিভঙ্গি অন্ধবিশ্বাসও নয়, আবার সব স্বপ্নকে উড়িয়ে দেওয়াও নয়। কিছু স্বপ্ন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সব স্বপ্ন নয়। বাইবেল যে বিষয়টি শেখায়, তা হলো বিবেচনাশক্তি - কোনটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটি নয়, তা বুঝতে পারা।
বাইবেলের বিখ্যাত স্বপ্নগুলো
আদিপুস্তক থেকে প্রেরিতদের কার্যবিবরণী পর্যন্ত, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে স্বপ্নের আবির্ভাব ঘটে। কখনও দুর্ভিক্ষ থেকে একটি পরিবারকে রক্ষা করার আগে, কখনও একটি সাম্রাজ্যের পতনের আগে, আবার কখনও এক নিষ্ঠুর রাজার হাত থেকে একটি শিশুকে বাঁচানোর আগে। বাইবেলের স্বপ্ন নিয়ে জানতে চাইলে এই ঘটনাগুলো সবার আগে জানা উচিত।
| স্বপ্নদ্রষ্টা | স্বপ্ন | অর্থ | বাইবেলের উল্লেখ |
|---|---|---|---|
| যাকোব | পৃথিবী ও স্বর্গের মাঝে একটি সিঁড়ি, যেখানে ফেরেশতারা উঠানামা করছেন | ঈশ্বর তাঁর প্রতিশ্রুতি নবায়ন করেন এবং যাকোবের সঙ্গে থাকার অঙ্গীকার করেন | আদিপুস্তক ২৮:১০-২২ |
| যোসেফ | ধানের আঁটি ও এগারোটি নক্ষত্র তাঁর সামনে নত হচ্ছে | মিশরে তাঁর ভাইদের ওপর ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব | আদিপুস্তক ৩৭:৫-১১ |
| পানপাত্রবাহক ও রুটিওয়ালা | আঙুরলতা থেকে রস নিংড়ানো এবং রুটিভর্তি ঝুড়ি | একজনের পুনর্বহাল, অন্যজনের বিচার | আদিপুস্তক ৪০ |
| ফারাও | সাতটি মোটাতাজা গরুকে সাতটি কৃশ গরু গ্রাস করছে | সাত বছর প্রাচুর্য, তারপর সাত বছর দুর্ভিক্ষ | আদিপুস্তক ৪১ |
| একজন মিদিয়ানীয় সৈনিক | যবের একটি রুটি মিদিয়ানের শিবিরকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে | গিদিয়োনের অপ্রত্যাশিত বিজয় | বিচারকর্তৃগণ ৭:১৩-১৫ |
| সলোমন | গিবিয়োনে ঈশ্বর আবির্ভূত হয়ে বলেন, 'আমি তোমাকে যা দিতে চাই, তা চাও' | সলোমন প্রজ্ঞাপূর্ণ হৃদয় প্রার্থনা করেন | ১ রাজাবলি ৩:৫-১৫ |
| নেবূখদনেজর | সোনা, রূপা, ব্রোঞ্জ, লোহা ও মাটির তৈরি এক বিশাল মূর্তি | সাম্রাজ্যগুলোর উত্থান ও পতন | দানিয়েল ২ |
| দানিয়েল | সমুদ্র থেকে চারটি বিশাল জন্তুর উঠে আসা | ভবিষ্যতের রাজ্যসমূহ এবং এমন একটি রাজ্য, যার কখনও অবসান হবে না | দানিয়েল ৭ |
| নাসরতের যোসেফ | চারটি স্বপ্ন: মরিয়মকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা, মিশরে পালিয়ে যাওয়া, ফিরে আসা এবং নাসরতে বসবাস করা | মরিয়ম ও শিশু যিশুকে রক্ষা করা | মথি ১-২ |
| প্রাচ্যদেশীয় জ্ঞানী ব্যক্তিরা | হেরোদের কাছে ফিরে না যাওয়ার সতর্কবার্তা | শিশুটির জীবন রক্ষা পায় | মথি ২:১২ |
| পীলাতের স্ত্রী | যিশুকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে তিনি গভীরভাবে কষ্ট পান | একটি সতর্কবার্তা, যা তাঁর স্বামী উপেক্ষা করেন | মথি ২৭:১৯ |
| পৌল | রাতের দর্শনে এক ব্যক্তি অনুরোধ করছেন, 'মাসিদোনিয়ায় এসে আমাদের সাহায্য করুন' | সুসংবাদ ইউরোপে পৌঁছে যায় | প্রেরিতদের কার্যবিবরণী ১৬:৯-১০ |
এখানে দুটি বিষয় সহজেই চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। প্রথমত, বাইবেলে স্বপ্ন সাধারণত বিপদ বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময়ে আসে, যখন এমন কিছু জানার প্রয়োজন হয় যা অন্য কোনোভাবে জানা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, কোনো স্বপ্নের ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলে তার কৃতিত্ব কখনও মানুষের বুদ্ধি বা বিশেষ কৌশলকে দেওয়া হয় না, বরং ঈশ্বরকেই দেওয়া হয়। বাইবেলের দুই প্রধান স্বপ্নব্যাখ্যাকারী যোসেফ ও দানিয়েল দুজনেই প্রায় একই ভাষায় এই কথাই বলেছেন। এই বিনয়ী দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তী সময়ে খ্রিস্টানদের স্বপ্ন-সম্পর্কিত চিন্তার ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
তোমাদের মধ্যে যদি কোনো ভাববাদী থাকে, আমি, সদাপ্রভু, দর্শনের মাধ্যমে তার কাছে নিজেকে প্রকাশ করি, আমি স্বপ্নে তার সঙ্গে কথা বলি।
Numbers 12:6
বাইবেলে বর্ণিত স্বপ্নের তিনটি প্রধান ধরন
বাইবেলে স্বপ্নের কোনো আনুষ্ঠানিক শ্রেণিবিভাগ দেওয়া হয়নি। তবে পুরো শাস্ত্রজুড়ে তিনটি বিস্তৃত ধরনের স্বপ্ন বারবার দেখা যায়:
- ঈশ্বরের কাছ থেকে আসা স্বপ্ন: প্রকাশ, সতর্কবার্তা বা উৎসাহের বার্তা বহন করতে পারে, যেমন দুই যোসেফ, সলোমন এবং প্রাচ্যের জ্ঞানীদের স্বপ্ন। কখনও ঈশ্বর সরাসরি কথা বলেন, আবার কখনও এমন প্রতীকের মাধ্যমে জানান যা ব্যাখ্যা করা দরকার। তবে এসব স্বপ্ন উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং যাচাই করেও টিকে থাকে।
- সাধারণ স্বপ্ন: ‘দুশ্চিন্তা বেশি হলে স্বপ্নও বেশি আসে’ (উপদেশক ৫:৩)। বাইবেল স্পষ্টভাবেই বলে যে অধিকাংশ স্বপ্ন মানুষের দিনের উদ্বেগ, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও নানা চিন্তারই প্রতিফলন।
- প্রতারণামূলক স্বপ্ন: দ্বিতীয় বিবরণ ১৩ অধ্যায়ে সতর্ক করা হয়েছে যে কোনো স্বপ্নদ্রষ্টার নিদর্শন সত্যি হলেও, যদি সে মানুষকে ঈশ্বর থেকে দূরে নিয়ে যেতে চায়, তবে তাকে গ্রহণ করা যাবে না। আবার যিরমিয় ২৩ অধ্যায়ে সেই সব ভাববাদীদের সমালোচনা করা হয়েছে যারা বারবার বলে, ‘আমি স্বপ্ন দেখেছি! আমি স্বপ্ন দেখেছি!’ কোনো স্বপ্নের আসল পরীক্ষা তার কতটা জীবন্ত ছিল তা নয়, বরং তা মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়।
বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী অধিকাংশ স্বপ্নই দ্বিতীয় ধরনের, অর্থাৎ সাধারণ স্বপ্ন। এটি জানা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে প্রতিটি স্বপ্নে লুকানো বার্তা খোঁজার চাপ থেকে মুক্ত থাকা যায়। আসল প্রশ্ন হলো, প্রতিটি স্বপ্নের অর্থ কী - তা নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ সেই বিরল স্বপ্নটিকে কীভাবে চিনবেন।
খ্রিস্টানরা কীভাবে একটি স্বপ্ন যাচাই করেন: ছয়টি নীতি
প্রথম যুগের গির্জার শিক্ষকদের থেকে শুরু করে আজকের পালকদের পর্যন্ত, খ্রিস্টান শিক্ষকদের মধ্যে কয়েকটি সহজ পরীক্ষার বিষয়ে বিস্তর ঐকমত্য রয়েছে। এর কোনোটির জন্যই স্বপ্নের প্রতীকের অভিধান দরকার হয় না।
- মনে রাখুন, এটি কার দান। কারাগারে যোসেফ বলেছিলেন, ‘ব্যাখ্যা কি ঈশ্বরের নয়?’ (আদিপুস্তক ৪০:৮)। আর দানিয়েল রাজাকে বলেছিলেন, কোনো জ্ঞানীই তার স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারে না, ‘কিন্তু স্বর্গে এমন এক ঈশ্বর আছেন যিনি গুপ্ত বিষয় প্রকাশ করেন’ (দানিয়েল ২:২৮)। তাই খ্রিস্টানরা প্রতীকের অর্থ খোঁজার আগে প্রার্থনা ও নম্রতা দিয়ে শুরু করেন।
- বাইবেলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। কোনো স্বপ্ন কখনোই বাইবেলের চেয়ে বড় কর্তৃত্ব নয়। যদি কোনো স্বপ্ন আপনাকে এমন কিছুর দিকে ঠেলে দেয়, যেটিকে বাইবেল ভুল বলে, তবে সেই স্বপ্ন গ্রহণযোগ্য নয়, তা যতই বাস্তব মনে হোক না কেন।
- প্রজ্ঞার জন্য প্রার্থনা করুন। ‘তোমাদের মধ্যে যদি কারও জ্ঞানের অভাব থাকে, তবে সে ঈশ্বরের কাছে চাইুক; তিনি সকলকে উদারভাবে দান করেন’ (যাকোব ১:৫)। বিচক্ষণতা নিজের বলে ধরে নেওয়া নয়, বরং ঈশ্বরের কাছে চাওয়ার বিষয়।
- ফলাফল লক্ষ্য করুন। ঈশ্বরের দিকনির্দেশনা সাধারণত শান্তি, স্পষ্টতা ও সাহস এনে দেয়, কারণ ‘ঈশ্বর আমাদের যে আত্মা দিয়েছেন, তা ভীরুতার নয়’ (২ তীমথিয় ১:৭)। বিভ্রান্তি, আতঙ্ক বা বাধ্য হওয়ার অনুভূতি ভালো লক্ষণ নয়।
- জ্ঞানী মানুষের পরামর্শ নিন। ‘পরামর্শের অভাবে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়, কিন্তু বহু পরামর্শদাতার মাধ্যমে তা সফল হয়’ (হিতোপদেশ ১৫:২২)। পরিণত কোনো বিশ্বাসী বা গির্জার পালক অনেক সময় এমন বিষয় দেখতে পারেন, যা আপনি নিজে বুঝতে পারেন না।
- লিখে রাখুন। দানিয়েল যখন তার গুরুত্বপূর্ণ স্বপ্ন দেখেছিলেন, তখন প্রথমেই সেটি লিখে রেখেছিলেন (দানিয়েল ৭:১)। ঘুম থেকে ওঠার কয়েক মিনিটের মধ্যেই স্বপ্নের অনেক কিছু ভুলে যায়, আর দীর্ঘ সময়ের নোট একসঙ্গে দেখলে তবেই ধারা বোঝা যায়। স্বপ্নের ডায়েরি রাখা এ জন্যই বহু পুরোনো এবং কার্যকর একটি অভ্যাস।
স্বপ্নে দেখা সাধারণ প্রতীক এবং বাইবেলভিত্তিক অর্থ
বাইবেলে স্বপ্নের প্রতীকের কোনো অভিধান নেই। সতর্ক খ্রিস্টান ব্যাখ্যাকারীরা জোর দিয়ে বলেন, একই প্রতীক ভিন্ন মানুষের জীবনে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। তবে বাইবেল অনেক প্রতীকের একটি সুস্পষ্ট ধারণা দেয়। লোককথা নয়, বাইবেলকে ভিত্তি ধরে সবচেয়ে বেশি খোঁজা কয়েকটি প্রতীক সাধারণত এভাবেই বোঝা হয়। একটি নিয়ম সব সময় মনে রাখুন - আগে প্রেক্ষাপট, পরে প্রতীকের সাধারণ অর্থ।
- সাপ: বাইবেলের শুরুতেই সাপকে প্রতারক হিসেবে দেখা যায় (আদিপুস্তক ৩)। তাই স্বপ্নে সাপ দেখা অনেক সময় প্রতারণা, প্রলোভন বা আশপাশের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সতর্কতার ইঙ্গিত হিসেবে বোঝা হয়। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমও আছে - মরুভূমিতে খুঁটির ওপর তোলা ব্রোঞ্জের সাপ ইস্রায়েলের আরোগ্যের মাধ্যম হয়েছিল (গণনা ২১:৯), আর পরে যীশু সেই ঘটনাকে নিজের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন (যোহন ৩:১৪)। অর্থাৎ বাইবেলের সবচেয়ে অন্ধকার প্রতীকও মুক্তির অর্থ বহন করতে পারে।
- পানি: জীবন্ত জল পবিত্র আত্মা ও নতুন জীবনের প্রতীক (যোহন ৪:১০), আর বন্যার পানি অতিরিক্ত চাপ বা বিপদের চিত্র তুলে ধরে - ‘জল আমার গলা পর্যন্ত এসে গেছে’ (গীতসংহিতা ৬৯:১)। তাই শান্ত পানি আর উত্তাল পানি এক অর্থ বহন করে না।
- পড়ে যাওয়া: বাইবেলে পড়ে যাওয়াকে অহংকার বা অবস্থান হারানোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, যেমন ‘অহংকার ধ্বংসের আগে আসে’ (হিতোপদেশ ১৬:১৮)। এমন স্বপ্ন সাধারণত নিয়ন্ত্রণ, মর্যাদা বা নিরাপত্তা হারানোর উদ্বেগের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
- দাঁত পড়ে যাওয়া: সত্য কথা হলো, এই ধরনের স্বপ্নের উল্লেখ বাইবেলে নেই। আধুনিক খ্রিস্টান ব্যাখ্যাকারীরা প্রায়ই দাঁতকে কথা বলার ক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত করেন। তাই এটি অপমানিত হওয়া, নিজের কথা বলতে না পারা বা গুরুত্ব না পাওয়ার ভয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
- মৃত্যু: বাইবেলে মৃত্যুর প্রতীক প্রায়ই এমন একটি সমাপ্তিকে বোঝায়, যা নতুন কিছুর পথ খুলে দেয়। যেমন, ফল ধরতে হলে গমের দানাকে মাটিতে পড়ে মরতে হয় (যোহন ১২:২৪)। তাই মৃত্যুর স্বপ্নকে সাধারণত বাস্তব মৃত্যুর পূর্বলক্ষণ হিসেবে নয়, বরং জীবনের একটি অধ্যায়, অভ্যাস বা পুরোনো পরিচয়ের সমাপ্তি হিসেবে দেখা হয়।
- শিশু ও গর্ভাবস্থা: নতুন সূচনা বা প্রতিশ্রুতির প্রতীক - ‘দেখ, আমি নতুন কিছু করছি’ (যিশাইয় ৪৩:১৯)। এটি অনেক সময় বাস্তব সন্তানের চেয়ে কোনো নতুন কাজ, আশা বা আহ্বানের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত হয়।
- উড়ে যাওয়া: এই ধরনের স্বপ্নের বর্ণনা বাইবেলে নেই। তবে সেখানে বলা হয়েছে, যারা সদাপ্রভুর ওপর আশা রাখে তারা ‘ঈগলের মতো ডানা মেলে উড়বে’ (যিশাইয় ৪০:৩১)। তাই এটি সাধারণত স্বাধীনতা, স্বস্তি বা বোঝা থেকে মুক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
- কেউ তাড়া করছে: ‘দুষ্ট লোক কাউকে তাড়া না করলেও পালায়’ (হিতোপদেশ ২৮:১)। এমন স্বপ্ন অনেক সময় এমন কোনো অমীমাংসিত বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে, যেমন ভয়, অপরাধবোধ বা এমন একটি কথোপকথন, যেটিকে আপনি এড়িয়ে যাচ্ছেন।
- আগুন: জ্বলন্ত ঝোপ থেকে শুরু করে পেন্টেকস্ট পর্যন্ত, ঈশ্বর আগুনের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করেছেন (যাত্রাপুস্তক ৩; প্রেরিত ২)। আবার আগুন পরীক্ষা ও শুদ্ধও করে (১ করিন্থীয় ৩:১৩)। তাই আগুনের স্বপ্নের অর্থ নির্ভর করে আগুন ধ্বংস করছে, নাকি উষ্ণতা দিচ্ছে তার ওপর।
- বিয়ে: চুক্তি, মিলন ও আনন্দের প্রতীক। বাইবেলের শেষ দৃশ্য একটি বিবাহভোজ (প্রকাশিত বাক্য ১৯:৭)। তাই বিয়ের স্বপ্নকে সাধারণত অঙ্গীকার, আপন হওয়া বা সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে বোঝা হয়।

খ্রিস্টীয় স্বপ্নের ব্যাখ্যা
পবিত্র বাইবেলের আলোকে আপনার স্বপ্নের অর্থ জানতে চান? আপনার স্বপ্ন শেয়ার করুন এবং বাইবেলের ভিত্তিতে যত্নসহকারে করা একটি ব্যাখ্যা পান।

উৎসাহদায়ক স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন দেখার পর কী করবেন
বাইবেলের স্বপ্নদ্রষ্টারা স্বপ্নের প্রতিক্রিয়ায় উদ্বিগ্ন না হয়ে প্রজ্ঞার সঙ্গে কাজ করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় খ্রিস্টান চর্চায় উৎসাহদায়ক স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্ন - উভয় ক্ষেত্রেই কিছু সহজ ও পরিচিত অভ্যাস গড়ে উঠেছে।
- উৎসাহব্যঞ্জক কোনো স্বপ্ন দেখার পর: ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিন, স্বপ্নটি স্পষ্ট মনে থাকা অবস্থাতেই লিখে রাখুন, তবে এটিকে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন না। যদি সত্যিই এটি তাঁর কাছ থেকে হয়ে থাকে, তাহলে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তা টিকে থাকবে: বাইবেল, সময় এবং জ্ঞানী মানুষের পরামর্শ একে সমর্থন করবে। সবার কাছে ঘোষণা না করে, আপনার বিশ্বাসভাজন কারও সঙ্গে বিষয়টি ভাগ করে নিন।
- দুঃস্বপ্ন দেখার পর: আবার ঘুমানোর আগে প্রার্থনা করুন, 'কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তোমাদের প্রার্থনা ও নিবেদন ঈশ্বরের কাছে জানাও' (ফিলিপীয় ৪:৬)। তারপর গীতসংহিতা ৪:৮-এর এই কথাটি মনে রাখুন: 'আমি শান্তিতে শয়ন করব ও নিদ্রা যাব, কারণ হে সদাপ্রভু, একমাত্র আপনিই আমাকে নিরাপদে বাস করান।' দুঃস্বপ্ন কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়, আর ভয়ের মাধ্যমে ঈশ্বর মানুষকে পরিচালিত করেন না। যদি বারবার খারাপ স্বপ্ন ফিরে আসে, তবে নিজের ঘুমের যত্ন নিন এবং বিশ্বাসযোগ্য কারও সঙ্গে কথা বলুন। এটি দুর্বলতার নয়, প্রজ্ঞার পরিচয়।
আজও কি ঈশ্বর স্বপ্নের মাধ্যমে কথা বলেন?
প্রাচীন খ্রিস্টীয় মণ্ডলী অবশ্য তাই বিশ্বাস করত। টার্টুলিয়ান তাঁর 'অন দ্য সোল' গ্রন্থে স্বপ্ন এবং তার উৎস নিয়ে কয়েকটি অধ্যায় লিখেছেন। অগাস্টিন তাঁর মা মনিকার সেই স্বপ্নকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন, যেখানে তাঁর বিশ্বাসে ফিরে আসার পূর্বাভাস ছিল। আর জেরোম এমন একটি স্বপ্ন দেখার পর জীবনের পথ বদলে ফেলেন, যেখানে তাঁকে খ্রিস্টের চেয়ে সিসেরোকে বেশি ভালোবাসার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। খ্রিস্টধর্মের প্রথম কয়েক শতকে স্বপ্ন ছিল বিশ্বাসীদের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতারই একটি অংশ।
মধ্যযুগে এসে গির্জা এ বিষয়ে আরও সতর্ক হয়ে ওঠে। গণনাবিবরণী নয়, বরং বাইবেলে জাদুবিদ্যা ও গণনার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা (দ্বিতীয় বিবরণ ১৮:১০-১২) থাকায় স্বপ্নের ব্যাখ্যাকে অনেকের কাছে ভাগ্য গণনার খুব কাছাকাছি মনে হতে শুরু করে, আর সেই সতর্কতা আজও পুরোপুরি দূর হয়নি। বর্তমানে খ্রিস্টানদের মধ্যে এ নিয়ে প্রকৃত মতভেদ রয়েছে। কেউ বিশ্বাস করেন, এখন ঈশ্বর শুধু বাইবেলের মাধ্যমেই কথা বলেন এবং প্রত্যাদেশমূলক স্বপ্ন ছিল কেবল প্রেরিতদের যুগের জন্য। আবার অনেকেই, বিশেষ করে অধিকাংশ পেন্টেকস্টাল ও ক্যারিসম্যাটিক গির্জা, পেন্টেকস্টের সময় উদ্ধৃত এই প্রতিশ্রুতির দিকে ইঙ্গিত করেন - 'তোমাদের বৃদ্ধেরা স্বপ্ন দেখবে' (প্রেরিত ২:১৭)। পাশাপাশি বিশ্বের নানা প্রান্তে এমন বহু বিশ্বাসে আসার গল্পও রয়েছে, যেগুলোর শুরু হয়েছিল একটি স্বপ্ন দিয়ে।
তবে উভয় পক্ষই একটি বিষয়ে একমত: কোনো স্বপ্নই বাইবেলের ঊর্ধ্বে নয়, এবং শেষ পর্যন্ত একটি স্বপ্নকে বিচার করা হয় তা মানুষকে কোথায় নিয়ে যায় তার ভিত্তিতে। যদি কোনো স্বপ্ন কাউকে সততা, ক্ষমা বা বিশ্বাসের দিকে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করে, তবে ব্যাখ্যা যাই হোক না কেন, সেটি ইতিবাচক প্রভাবই ফেলেছে।
আপনি ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা যেভাবেই দেখুন না কেন, দানিয়েলের একটি অভ্যাস অনুসরণ করার মতো: তিনি স্বপ্নের অর্থ বোঝার চেষ্টা করার আগে সেটি লিখে রাখতেন (দানিয়েল ৭:১)। Ruya-ও খ্রিস্টীয় স্বপ্নের ব্যাখ্যায় ঠিক এই পদ্ধতিই অনুসরণ করে। আপনি আপনার জার্নালে স্বপ্নটি লিখে রাখবেন, নিজের জীবন ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কয়েকটি সহজ প্রশ্নের উত্তর দেবেন, তারপর বাইবেলের আলোকে চিন্তাশীল, প্রার্থনামুখী এবং কুসংস্কারমুক্ত একটি ব্যাখ্যা পাবেন। জার্নালটি বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায়, আর আপনার স্বপ্নগুলো লিখে রাখার মতোই মূল্যবান।