
hotel_classনির্বাচিত নিবন্ধ
স্বপ্নে প্রাক্তনকে দেখা: এর মানে কী এবং কেন বারবার ফিরে আসে
কত বছর হয়ে গেল ওর সঙ্গে কথা নেই। আপনি এখন ভালো আছেন, অন্তত গুছিয়ে নিয়েছেন নিজেকে। হঠাৎ এক রাতে স্বপ্নে সে হাজির। যে রান্নাঘর এখন আর আপনার নয়, সেখানে হাসছে। কিংবা একটা কথাও না বলে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। অথবা বলল, ফিরে এসো। ঘুম ভাঙার পর মনটা অস্থির লাগে, কখনো একটু অপরাধবোধ, কখনো মন খারাপ। সারা সকাল ভাবতে থাকেন, এর মানে কী। স্বপ্নে প্রাক্তনকে দেখা সবচেয়ে সাধারণ স্বপ্নগুলোর একটি, আবার সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝা স্বপ্নও এটাই। এই লেখায় দেখব ঘুম নিয়ে গবেষণা আসলে কী বলে, মনোবিজ্ঞান এই স্বপ্নকে কীভাবে পড়ে, আধ্যাত্মিক ধারা, ইসলাম ও বাইবেলে এর ব্যাখ্যা কী, প্রচলিত ধরনগুলোর সাধারণ অর্থ কী, আর একই প্রাক্তন রাতের পর রাত স্বপ্নে এলে কী করবেন।
স্বপ্নে প্রাক্তনকে দেখা নিয়ে গবেষণা কী বলে
স্বপ্ন নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁদের একটা সহজ ধারণা আছে, যার নাম ধারাবাহিকতার অনুমান (continuity hypothesis)। এর মূল কথা হলো, আমরা জেগে থাকা অবস্থায় যাদের সঙ্গে থাকি আর যা নিয়ে ভাবি, স্বপ্নেও সাধারণত তারাই ফিরে আসে। প্রাক্তনরা এই ধারণার সঙ্গে চমৎকার মিলে যায়। ৪২৫ জন শিক্ষার্থীর ১,৬১২টি স্বপ্নের ডায়েরি নিয়ে করা এক গবেষণায় ঘুম-গবেষক মাইকেল শ্রেডল (Michael Schredl) ও লিসা উড দেখেছেন, বর্তমান সঙ্গী স্বপ্নে প্রাক্তনের চেয়ে অনেক বেশি আসে। তবু প্রাক্তনরাও নিয়মিতই আসে, প্রায় প্রতি বারোটি স্বপ্নে একটিতে। আবেগের ধরনটা মিশ্র। বর্তমান সঙ্গীর তুলনায় প্রাক্তনের সঙ্গে স্বপ্নের মিথস্ক্রিয়া বেশি নেতিবাচক হয়, আবার প্রাক্তনের স্বপ্নে বন্ধুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক অনুভূতিও বেশি থাকে। কারণ বর্তমান সঙ্গীর স্বপ্ন বেশিরভাগই সাদামাটা, যেমন একসঙ্গে কোনো কাজে বের হওয়া, নাটকীয় কিছু নয়।
একই গবেষক দল ১,৬৯৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর একটি বড় অনলাইন জরিপ চালায়। তাতে দেখা যায়, বিচ্ছেদের বহু বছর পরও প্রাক্তনকে নিয়ে স্বপ্ন বেশ ঘন ঘন আসে, আর সেগুলো সাধারণত বর্তমান সঙ্গীকে নিয়ে দেখা স্বপ্নের চেয়ে কম সুখকর। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রমাণ এসেছে রোজালিন্ড কার্টরাইটের (Rosalind Cartwright) কাছ থেকে। তিনি কয়েক দশক ধরে বিবাহবিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের স্বপ্ন নিয়ে কাজ করেছেন। ১৯৯১ সালের তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, বিচ্ছেদের শুরুর দিকে যাঁরা প্রাক্তন স্বামী বা স্ত্রীকে স্বপ্নে দেখেছিলেন, এক বছর পর তাঁরা যাঁরা দেখেননি তাঁদের চেয়ে ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পেরেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ২০০৬ সালের আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, দিনের বেলা কেউ প্রাক্তনকে নিয়ে যত দুশ্চিন্তা করেন, স্বপ্নে প্রাক্তন তত বেশি আসে। আর বিষণ্নতা থেকে সেরে ওঠা মানুষদের স্বপ্নে প্রাক্তন এমন এক আবেগের গল্পের অংশ হয়ে আসত, যার একটা সমাধানের দিকে এগোনো ছিল। কার্টরাইটের সিদ্ধান্ত ছিল, একজন থেরাপিস্ট যেভাবে কাজ করেন, স্বপ্নদেখা মনও হারানোর কষ্টকে সেভাবেই সামলায়: অনুভূতিটা বারবার ফিরে দেখে, যতক্ষণ না তার ধার কমে যায়।
এ থেকে দুটো কথা বেরিয়ে আসে। প্রথমত, প্রাক্তনকে স্বপ্নে দেখা মানে এই নয় যে আপনি গোপনে তাকে ফিরে পেতে চান। একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে মস্তিষ্ক নিজের মতো করে, নিজের সময়ে গুছিয়ে রাখে, এটা তারই স্বাভাবিক নিয়ম। দ্বিতীয়ত, স্বপ্নটা নিছক অর্থহীন শব্দও নয়। ডিলান সেল্টারম্যান (Dylan Selterman) ও তাঁর সহযোগীরা দুই সপ্তাহ ধরে কয়েকটি দম্পতিকে অনুসরণ করেছিলেন। তাঁরা দেখেছেন, সঙ্গীকে নিয়ে কেউ যা স্বপ্নে দেখেন, যেমন ঈর্ষা বা ঝগড়া, পরদিন তাঁদের মধ্যে বেশি দ্বন্দ্ব আর কম ঘনিষ্ঠতা দেখা যায়। স্বপ্নের রেশ সকাল পর্যন্ত গড়ায়। তাই আপনার স্বপ্নটা আসলে কীসের দিকে ইশারা করছে, সেটা বুঝে নেওয়া কাজে দেয়।
স্বপ্নে প্রাক্তনকে দেখার মনস্তাত্ত্বিক মানে
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বপ্নের আসল বিষয় প্রাক্তন নিজে নন। কোনো অনুভূতি, শিক্ষা বা জীবনের একটা সময়কে বোঝাতে আপনার স্মৃতিতে সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতীক হয়ে ওঠেন তিনি। মনোবিজ্ঞানীরা সাধারণত নিচের ব্যাখ্যাগুলোর দিকেই ঝোঁকেন।
- অসমাপ্ত অধ্যায়। কোনো কথা না বলেই শেষ হয়ে যাওয়া বিচ্ছেদ, চাওয়া বা দেওয়া হয়নি এমন একটা ক্ষমা, উত্তর না পাওয়া একটা প্রশ্ন। গল্পটার তো এখনো শেষ হয়নি, তাই স্বপ্ন বারবার সেই দৃশ্যটাই সাজায়।
- বর্তমান সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা। নতুন সম্পর্কে পরিচিত কোনো সমস্যা এলে মন খুঁজে নেয়, শেষবার এমন লাগার সময়টা কেমন ছিল। তখন প্রাক্তন আসেন তুলনার মাপকাঠি হয়ে, ফিরে পাওয়ার প্রার্থী হয়ে নয়।
- নিজেরই একটা অংশ। কার্ল ইয়ুংয়ের (Carl Jung) ব্যাখ্যায় স্বপ্নের রোমান্টিক চরিত্র প্রায়ই স্বপ্নদ্রষ্টার নিজের ভেতরের জগতের গুণগুলো বহন করে, যাকে তিনি বলেছেন অ্যানিমা ও অ্যানিমাস। প্রাক্তন তখন প্রতীক হতে পারেন সেই সময়ের আপনার সহজাত প্রাণবন্ততা, আত্মবিশ্বাস বা কোমলতার। অথবা এমন কোনো গুণের, যা আপনি তাঁর ওপর প্রক্ষেপণ (projection) করেছিলেন আর এখন নিজের মধ্যেই খুঁজে নিতে হবে।
- জীবনের একটা সময়। বিশের কোঠার শুরুর কোনো প্রাক্তন হয়তো বাইশ বছর বয়সটারই সংক্ষিপ্ত রূপ: দায়দায়িত্ব কম, শহরটা আলাদা, আপনি তখন আরও মুক্ত। স্বপ্নটা তখন মানুষটাকে নিয়ে নয়, সেই অধ্যায়টাকে নিয়ে।
- চাপের সময় পুরোনো সংযুক্তি জেগে ওঠা। জন বাউলবি (John Bowlby) দেখিয়েছেন, বিপদ বা অনিরাপত্তা টের পেলে আমরা একসময় যাদের ওপর ভরসা করতাম, তাদেরই খুঁজি। এটা আমাদের গড়নের মধ্যেই আছে। চাপ, একাকিত্ব বা অসুস্থতার সময় মন পুরোনো স্বস্তির উৎসের দিকে হাত বাড়ায়, সেই মানুষটা আপনার জন্য ভালো না হলেও।
- যে ইশারাটা খেয়াল করেননি। একটা গান, কোনো পরিচিত বন্ধু, একটা বিশেষ তারিখ, ফোনের গ্যালারিতে হঠাৎ ভেসে ওঠা একটা ছবি। ফ্রয়েড (Freud) একে বলেছেন দিনের অবশেষ (day residue): সারা দিনের ছোট ছোট টুকরো দিয়েই স্বপ্ন গড়ে ওঠে, আর প্রাক্তন এমন এক তৈরি চরিত্র, যাঁর সঙ্গে অনেক অনুভূতি জড়িয়ে আছে।
ফ্রয়েড আরও বলতেন, কিছু প্রাক্তনের স্বপ্ন সরাসরি ইচ্ছাপূরণ, আর কখনো কখনো কথাটা সত্যিও। কিন্তু স্বপ্নে কিছু চাওয়া মানে কোনো নির্দেশ পাওয়া নয়। এটা শুধু জানান দেয় আপনি কী মিস করছেন, আর সেটা সাধারণত একটা অনুভূতি, কোনো মানুষ নয়। এর মধ্যে কোন ব্যাখ্যাটা আপনার সঙ্গে মেলে, তা বের করার জন্যই ইয়ুংয়ের স্বপ্নব্যাখ্যা বা নেরেটিভ থেরাপির মতো পদ্ধতি তৈরি হয়েছে।

আপনার স্বপ্ন কী বলতে চাইছে?
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আপনার স্বপ্নকে নতুনভাবে দেখুন—ইউঙ্গীয় প্রতীক ও আর্কিটাইপ থেকে শুরু করে আপনার দৈনন্দিন ভাবনা ও দুশ্চিন্তা পর্যন্ত।
স্বপ্নে প্রাক্তন দেখার সাধারণ ধরন ও তার মানে
প্রাক্তন স্বপ্নে এসেছে, এটার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বপ্নটা ঠিক কেমন ছিল। নিচের প্রতিটি ধরনে নিজের জন্য একটা প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। কোনোটাই ভবিষ্যদ্বাণী নয়।
| স্বপ্নটা কেমন | স্বপ্নটা সাধারণত যে প্রশ্ন তোলে |
|---|---|
| প্রাক্তনের সঙ্গে আবার ফিরে আসা | ওই সম্পর্কটা আপনাকে এমন কী দিত, যা এখন নেই? বিশেষভাবে বেছে নেওয়ার অনুভূতি, বুঝতে পারার অনুভূতি, নাকি রোমাঞ্চ? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটা একটা অনুভূতির জন্য আকুলতা, ফিরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নয়। |
| প্রাক্তন আপনাকে পাত্তা দিচ্ছে না বা চলে যাচ্ছে | অনেক সময় এটা প্রত্যাখ্যানের পুরোনো কষ্টের পুনরাবৃত্তি, অথবা অফিসে বা সংসারে বর্তমান কোনো পরিস্থিতিতে অবহেলিত হওয়ার ভয়। |
| প্রাক্তনের সঙ্গে ঝগড়া বা তর্ক | যে রাগ কখনো বলার সুযোগ পায়নি। কার্টরাইটের গবেষণায় দেখা গেছে, স্বপ্নে যাঁরা প্রাক্তনের মুখোমুখি হয়ে দৃঢ়ভাবে নিজের কথা বলেছেন, তাঁরা চুপ করে থাকাদের চেয়ে দ্রুত সেরে উঠেছেন। তাই এটা বরং ভালো লক্ষণ হতে পারে। |
| প্রাক্তন নতুন কারও সঙ্গে | তুলনা আর নিজের মূল্যবোধের প্রশ্ন: আমি কি যথেষ্ট ভালো, নাকি পিছিয়ে পড়ছি? প্রাক্তন বাস্তবে কী করছে, তার সঙ্গে এর সম্পর্ক প্রায় থাকেই না। |
| প্রাক্তন ক্ষমা চাইছে | যে মনের শান্তি আপনি পাননি, মন নিজেই সেটা দিতে চাইছে। ক্ষমাটা স্বপ্নেই আপনি গ্রহণ করতে পারেন। এগিয়ে যেতে বাস্তবের ক্ষমা চাওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হবে না। |
| প্রাক্তনকে চুমু খাওয়া বা তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া | সাধারণত ওই মানুষটার চেয়ে বরং ঘনিষ্ঠতা ও চাওয়ার একটা সামগ্রিক অনুভূতির কথা বলে। দীর্ঘদিনের বা ক্লান্ত সম্পর্কে এমন স্বপ্ন খুবই সাধারণ। এটা বিশ্বাসঘাতকতা নয়, আর কিছু একটা করে ফেলার ইঙ্গিতও নয়। |
| প্রাক্তন মারা যাচ্ছে বা আঘাত পাচ্ছে | একটা সমাপ্তিকে প্রতীকের ভাষায় মেনে নেওয়ার চেষ্টা। আসলে মরছে সম্পর্কটা, কিংবা ওই সম্পর্কের প্রতি আপনার টান। এতে কষ্ট আর স্বস্তি দুটোই একসঙ্গে থাকতে পারে। |
| বহু বছর মনে পড়েনি, এমন প্রাক্তন | প্রায় সব সময়ই এটা প্রাক্তনের কথা নয়, সেই সময়টার কথা: তখন আপনি কেমন ছিলেন, কী চাইতেন, তারপর কী হারিয়েছেন আর কী পেয়েছেন। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, তখনকার আপনি আজকের জীবনটা দেখে কী বলত। |
স্বপ্নে প্রাক্তন দেখার আধ্যাত্মিক অর্থ
যে প্রাক্তনের সঙ্গে আর কথা হয় না, তাকে স্বপ্নে দেখলে বেশিরভাগ মানুষ আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা হিসেবে যেটা খোঁজেন, সেটা হলো অসমাপ্ত বন্ধনের ধারণা। অনেক ঐতিহ্যেই এর কাছাকাছি কিছু একটা বলা আছে: আত্মার বন্ধন, শক্তির সুতো, কিংবা জীবন থেকে চলে যাওয়া মানুষটার দিকে এখনো টেনে রাখা মনোযোগের একটা ডোর। এই ব্যাখ্যায় স্বপ্নটা প্রাক্তনের পাঠানো কোনো বার্তা নয়, যোগাযোগ করার ইশারাও নয়। এটা শুধু জানিয়ে দেয় যে আপনার শক্তির একটা অংশ এখনো অতীতে আটকে আছে, আর সেটাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনার একটা ডাক।
বাস্তব দিকটা নিয়ে আধ্যাত্মিক গুরুরা মোটামুটি একমত। স্বপ্নটা চায় ছেড়ে দেওয়া, ফিরে যাওয়া নয়: নিজে নিজেই যে ক্ষমা করা যায় সেটা করা, সম্পর্কটা যা শিখিয়েছে তার জন্য কৃতজ্ঞ হওয়া, আর অধ্যায়টা শেষ করার স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া। কেউ কেউ ছোট একটা আচার দিয়ে এটা চিহ্নিত করেন, যেমন এমন একটা চিঠি লেখা যা কখনো পাঠানো হবে না, কিংবা হাঁটতে বেরিয়ে জোরে জোরে বিদায় জানানো। স্বপ্নগুলো যদি গভীর প্রশান্তি নিয়ে আসে, অনেকে সেটাকে বন্ধন অবশেষে আলগা হওয়ার চিহ্ন মনে করেন। আর যদি ভয় বা অস্বস্তি নিয়ে আসে, তাঁরা সেটাকে ওই সম্পর্কের এমন একটা শিক্ষা হিসেবে দেখেন যা এখনো নেওয়া হয়নি, প্রায়ই সীমারেখা টানা বা আত্মসম্মান নিয়ে। যেভাবেই দেখুন, স্বপ্নের আঙুল শেষ পর্যন্ত আপনার দিকেই ফেরে, আর বদলানোর ক্ষমতাও ঠিক সেখানেই।
ইসলামে স্বপ্নে প্রাক্তনকে দেখার ব্যাখ্যা
ইসলামে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুরু হয় একটা প্রশ্ন দিয়ে: এটা কোন ধরনের স্বপ্ন? রাসুলুল্লাহ (সা.) শিখিয়েছেন, স্বপ্ন তিন প্রকার: আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য স্বপ্ন, শয়তানের পক্ষ থেকে দুশ্চিন্তার স্বপ্ন, আর মানুষ দিনের বেলা যা ভাবে ও মনে ঘুরপাক খায় তারই প্রতিফলন। প্রাক্তনকে নিয়ে দেখা বেশিরভাগ স্বপ্ন তৃতীয় প্রকারের। এগুলো স্মৃতি, আকুলতা, আফসোস বা দুশ্চিন্তা থেকে জন্ম নেয়, ওই মানুষটা সম্পর্কে আল্লাহর কোনো নির্দেশ এতে থাকে না।
স্বপ্ন তিন প্রকার: ভালো স্বপ্ন, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ; শয়তানের পক্ষ থেকে স্বপ্ন, যা কষ্ট দেয়; আর মানুষ নিজে যা ভাবে সেখান থেকে আসা স্বপ্ন।
Hadith narrated by Abu Hurairah, Sahih Muslim (paraphrased)
ইবনে সিরিনের নামে প্রচলিত ক্লাসিক স্বপ্নব্যাখ্যার বইগুলোতে আজকের অর্থে প্রাক্তনের আলাদা কোনো উল্লেখ নেই। তবে সেখানে বিয়ে আর তালাককে প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। ইবনে সিরিনের স্বপ্নব্যাখ্যা অনুযায়ী স্বপ্নে তালাক দেখা মানে জীবনের কোনো বিষয় থেকে হারানো বা বিচ্ছিন্ন হওয়া। আর প্রাক্তন স্ত্রী বা স্বামী ফিরে আসাকে কিছু ব্যাখ্যাকার দেখেছেন পুরোনো কোনো অবস্থা, অভ্যাস বা দায়িত্ব ফিরে আসার ইঙ্গিত হিসেবে। এই দৃষ্টিতে স্বপ্নে প্রাক্তনকে দেখার অর্থ হতে পারে, জীবনের সেই সময়ের কোনো অসমাপ্ত বিষয়, অথবা এখনকার এমন কোনো পরিস্থিতি যা সেই সময়ের মতো। ব্যাখ্যাকাররা প্রেক্ষাপটের ওপরও জোর দিয়েছেন: স্বপ্নদ্রষ্টার বর্তমান অবস্থা, স্বপ্নে কী বলা হয়েছে ও কেমন লেগেছে, আর ঘুম ভাঙার পর মনে শান্তি ছিল নাকি অস্বস্তি।
এরপর আলেমদের দিকনির্দেশনা প্রায় একই রকম। স্বপ্ন দেখে প্রাক্তনের সঙ্গে যোগাযোগ করা, ভালো কারণে ভেঙে যাওয়া সংসার আবার জোড়া লাগানো, কিংবা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হতে পারে না। সিদ্ধান্ত নিতে হয় জেগে থাকা অবস্থায়, ভেবেচিন্তে, পরামর্শ করে এবং ইস্তিখারা করে। ইস্তিখারা হলো কোনো সিদ্ধান্তে আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া, প্রাক্তন আপনার জন্য নির্ধারিত কি না তা জানার উপায় নয়। স্বপ্নটা যদি কষ্টের বা অস্থির করার মতো হয়, সুন্নাহ হলো আল্লাহর কাছে এর অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া, পাশ ফিরে শোয়া এবং কাউকে স্বপ্নটা না বলা। আর স্বপ্ন ভালো লাগলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন এবং শুধু বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে তা বলুন। একই স্বপ্ন বারবার এলে একে ইঙ্গিত মনে করুন যে স্বপ্নের পেছনের অনুভূতিটাকে সামলানো দরকার। নামাজ-দোয়া, নিজের সঙ্গে সৎভাবে ভাবা, কিংবা কোনো বিজ্ঞ মানুষের সঙ্গে কথা বলার মাধ্যমে তা করা যায়।
বাইবেল ও খ্রিস্টান ব্যাখ্যা
ইউসুফ থেকে শুরু করে পূর্বদেশীয় পণ্ডিতদের কাহিনি পর্যন্ত বাইবেলে স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এটাও স্পষ্ট বলা আছে যে বেশির ভাগ স্বপ্ন আসে ব্যস্ত ও ভারাক্রান্ত মন থেকে: "বহু কাজের ঝামেলা থেকেই স্বপ্ন আসে" (উপদেশক ৫:৩)। খ্রিস্টান পাঠকেরা সাধারণত প্রাক্তনকে নিয়ে দেখা স্বপ্নকে এই ভাগেই রাখেন। অর্থাৎ এটা মনের ভেতরের কোনো বিষয় নিয়ে কাজ করার ফল, কোনো মানুষ সম্পর্কে ঈশ্বরের বার্তা নয়। প্রাক্তন সঙ্গীর বিষয়ে বাইবেলে সরাসরি কোনো আয়াত নেই, তাই বিশ্বাসীরা অতীত নিয়ে এর সাধারণ উপদেশের ওপর ভরসা করেন।
তোমরা আগেকার ঘটনার কথা আর মনে করো না, অতীতের কথা আর ভেবো না। দেখ, আমি এক নতুন কাজ করছি; তা এখনই অঙ্কুরিত হচ্ছে, তোমরা কি তা বুঝতে পারছ না?
Isaiah 43:18-19 (New International Version)
পৌল লিখেছেন, "যা পিছনে ফেলে এসেছি তা ভুলে গিয়ে সামনে যা আছে তার দিকে এগিয়ে চলেছি" (ফিলিপীয় ৩:১৩)। আর হিতোপদেশ বলে, সবকিছুর আগে নিজের হৃদয়কে রক্ষা করো, "কারণ তা থেকেই জীবনের সবকিছু উৎসারিত হয়" (হিতোপদেশ ৪:২৩)। দুটো একসঙ্গে পড়লে বোঝা যায়, প্রাক্তনকে নিয়ে বারবার স্বপ্ন দেখলে খ্রিস্টান দৃষ্টিতে করণীয় স্বপ্নের মানে খোঁজা নয়, বরং প্রার্থনার মধ্য দিয়ে তা পার করা। যাকে ক্ষমা করার আছে তাকে ক্ষমা করা, যে ক্ষত এখনো রয়ে গেছে তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করা, আর ভালো কারণে বন্ধ হওয়া দরজা আবার খোলার ব্যাপারে সতর্ক থাকা। যাজকেরাও সহজেই বলেন, সম্পর্কটা ক্ষতিকর হয়ে থাকলে তাকে নিয়ে কোমল একটা স্বপ্ন দেখার অর্থ এই নয় যে ঈশ্বর আপনাকে ফিরে যেতে বলছেন। স্বপ্নের কোমলতা আসলে স্মৃতিরই কাজ।
একই প্রাক্তন বারবার স্বপ্নে এলে
একবার স্বপ্নে প্রাক্তনকে দেখলে আপনার কিছু করার দরকার নেই। কিন্তু বারবার দেখলে দরকার আছে। অন্য বারবার দেখা স্বপ্নের মতোই এটাও সাধারণত থেমে যায়, যখন বাস্তবের যে বিষয়টা এর পেছনে কাজ করছে সেটার সমাধান হয়। সাধারণত এই ক্রমে এগোলে কাজ হয়।
- ঘুম থেকে উঠেই লিখে রাখুন। স্বপ্নে প্রাক্তন কী করেছিল, স্বপ্নে আপনার কেমন লেগেছিল আর ঘুম ভাঙার পর কেমন লাগল, সব লিখুন। তিন-চারবার লেখার পর সাধারণত একটা ছক ধরা পড়ে: একই দৃশ্য, একই অনুভূতি, কিংবা আগের দিনের একই ধরনের কোনো ঘটনা।
- প্রাক্তন আপনার কাছে কীসের প্রতীক, তা চিনুন। বাক্য দুটো শেষ করুন: "ওর কথা ভাবলে আমার বেশির ভাগ সময় মনে হয়..." আর "আমি আসলে যেটা মিস করি সেটা হলো..."। দ্বিতীয় উত্তরটাই স্বপ্নের আসল বিষয়।
- কী থেকে শুরু হলো, খুঁজে দেখুন। আগের দিনটা ভাবুন: কোনো মেসেজ, ছবি, বিশেষ কোনো তারিখ, বর্তমান সঙ্গীর সঙ্গে ঝগড়া, বা চাপের একটা সপ্তাহ। স্বপ্ন সাধারণত শূন্য থেকে আসে না।
- বাস্তবের কাজটা সেরে ফেলুন। যে চিঠি পাঠাবেন না, সেটা লিখে ফেলুন। যে সম্পর্কের শেষটা ঠিকমতো মেনে নেননি, তার জন্য শোক করুন। স্বপ্ন যে বিষয়টা নিয়ে বারবার তুলনা করে, সেটা নিয়ে বর্তমান সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন। কাজটা হয়ে গেলে স্বপ্নও ফিকে হয়ে আসে।
- স্মৃতি জাগানো জিনিস কমান। মিউট বা আনফলো করুন, ছবিগুলো আর্কাইভ করুন, প্লেলিস্টটা সরিয়ে রাখুন। অতীত মুছে ফেলছেন না, শুধু আগের দিনের যে রেশ নিয়ে স্বপ্ন তৈরি হয়, সেটা কমাচ্ছেন।
- থামছে না মনে হলে সাহায্য নিন। স্বপ্নগুলো কয়েক মাস ধরে চলছে, আপনাকে অস্থির করে তুলছে, বা কোনো নির্যাতনমূলক সম্পর্কের পর শুরু হয়েছে, এমন হলে একজন থেরাপিস্টের সঙ্গে কথা বলুন। ব্রেকআপের কষ্ট এবং ট্রমা, দুটোতেই চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়া যায়, আর কাজ এগোলে স্বপ্নগুলোও সাধারণত শান্ত হয়ে আসে।
স্বপ্নে প্রাক্তনকে দেখা মানে কি সে-ও আপনাকে ভাবছে?
গভীর রাতে বেশির ভাগ মানুষ আসলে এই প্রশ্নটাই খোঁজে, তাই সোজা উত্তর দেওয়া দরকার। কাউকে স্বপ্নে দেখা মানে সে আপনাকে ভাবছে, মিস করছে বা যোগাযোগ করতে যাচ্ছে, এর কোনো প্রমাণ নেই। স্বপ্নটা তৈরি হয় আপনার স্মৃতি আর অনুভূতি দিয়ে। স্বপ্নের প্রাক্তন আপনারই গড়া একটা রূপ, যেদিন আলাদা হয়েছিলেন সেদিনেই থেমে থাকা। সে এখন কেমন মানুষ, তা বোঝার জন্য স্বপ্ন তাই ভালো পথ নয়। স্বপ্ন দেখার পর মেসেজ দেওয়ার ইচ্ছা হলে এক সপ্তাহ অপেক্ষা করুন। সপ্তাহ পার হয়ে দিনের আলোয়ও ইচ্ছাটা থেকে গেলে তখন সেটা নিয়ে নিজের মতো করে ভাবতে পারবেন, স্বপ্নের প্রভাবে নয়।

স্বপ্নে এক্সকে দেখা মানে আপনার সম্পর্ক, চরিত্র বা ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো রায় নয়। এটা স্মৃতি আর অনুভূতির ধীরে ধীরে নিজের কাজ করে যাওয়া, আর গবেষণা বলছে এই কাজ সাধারণত আপনার ভালোই করে। আপনার স্বপ্নটা ঠিক কী বলছে বুঝতে চাইলে সেটা Ruya-তে লিখে রাখুন, তারপর নিজের দেখার ধরনের সঙ্গে মানানসই পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করুন: ওই সম্পর্ক নিয়ে আপনি এখনো যে গল্পটা মনে মনে বলে চলেছেন, তার জন্য বর্ণনামূলক পদ্ধতি; এক্স আপনার ভেতরের কোন দিকটা বহন করছে, তার জন্য ইয়ুঙ্গীয় পদ্ধতি; আর ঈমান ও বিশ্বাসের প্রশ্নগুলোর জন্য ইসলামি ও খ্রিস্টীয় পদ্ধতি। দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা, স্বপ্ন একটাই, আর উত্তরটা হবে আপনার নিজের, ওই মানুষটার নয়। পদ্ধতিগুলো কীভাবে আলাদা, দেখুন।
স্বপ্নে এক্সকে দেখা: যে প্রশ্নগুলো সবাই করে
স্বপ্নে এক্সকে দেখলে কী বোঝায়?
যার সঙ্গে আর কথা হয় না, তাকে বারবার স্বপ্নে দেখি কেন?
স্বপ্নে এক্সকে দেখা মানে কি সে আমার কথা ভাবছে?
স্বপ্নে এক্সকে দেখার আধ্যাত্মিক অর্থ কী?
ইসলামে স্বপ্নে এক্সকে দেখার ব্যাখ্যা কী?
স্বপ্নে এক্সকে দেখা কি ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত?
বর্তমান সঙ্গীর সঙ্গে সুখে থেকেও এক্সকে স্বপ্নে দেখি কেন?
এক্সকে স্বপ্নে দেখা বন্ধ করব কীভাবে?
এই নিবন্ধটি কি আপনার কাজে লেগেছে?


